গিয়াস উদ্দিন আহাম্মাদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গিয়াস উদ্দিন আহাম্মাদ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

পর্ব ৪ তন্ত্র যুদ্ধে রক্ত বাসর গিয়াস উদ্দিন আহাম্মাদ

পর্ব ৪

তন্ত্র যুদ্ধে রক্ত বাসর 

গিয়াস উদ্দিন আহাম্মাদ 


ডালিকে সেই অবস্থায় দেখে আমার ভিতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছিল।

সে দাঁড়িয়ে আছে জানালার ধারে —

চুল এলোমেলো, ঠোঁটে রক্তের রেখা, আর চোখে সেই অচেনা শূন্যতা।

এটা আমার বউ না।

এটা... **মঞ্জুরা।**


— “তুই কী চাস?” আমি গর্জে উঠলাম।

— “ডালিকে ছেড়ে দে! আমি তোদের কিছু করিনি!”


সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকালো,

— “তুই কিছু করোনি…

কিন্তু তোর রক্ত করেছিল!

আমি তো ভালোবেসেছিলাম… আমি তো প্রতীক্ষা করেছিলাম...

কিন্তু সে গিয়েছিল অন্যের কাছে।

এবার আমার পালা, আমি সব নিয়ে নেবো!”


⚡ হঠাৎ ঘরের বাতাস দপদপিয়ে উঠলো।

জানালার পর্দা বাতাস ছাড়াই দুলছে।

আয়না থেকে মিহি কণ্ঠে একটা কর্কশ হাসি ভেসে আসে।


আমি ভয়ে কুঁকড়ে যাই —

তবু সাহস করে পিসিমার ঘরে ছুটে গিয়ে একটা পুরনো কাঠের বাক্স বের করলাম।

ওটা আমার ঠাকুরদার — একজন হোমিও ডাক্তার,

তাঁর কিছু পুরনো জিনিস ছিল।


বাক্স খুলতেই পেলাম


* একটা পুরনো **তামার মুদ্রা**,

* কিছু **পুঁতির মালা**,

* আর চামড়ায় মোড়া একটা পাতলা খাতা — তাতে লেখা:


> **"দেহ ছাড়া আত্মা তাড়ানোর বিধান (১৯৩২)"**


আমি আঁকড়ে ধরলাম সেটাই।

পিসিমা বললো,

— “তোর আত্মা তো দায়ী নয়,

তুই প্রেম করিস, তুই ভুল করোনি —

কিন্তু তোকে মঞ্জুরাকে বোঝাতে হবে,

ভালোবাসা অনুরাগ চায়, প্রতিশোধ না!”


---


দেহতাড়ানো শুরু হয়...


আমি ঘরে ফিরে আসতেই দেখি,

ডালি এখন ছটফট করছে বিছানার ওপর।

ওর মুখ থেকে ঝরছে দুটো কণ্ঠস্বর —

একটা ডালির কণ্ঠ, অন্যটা গভীর, বিষে ভরা।


আমি মন্ত্র পড়া শুরু করলাম, সেই খাতার পৃষ্ঠ থেকে:


> "যা তুই, যে ছিলি শূন্যের সন্তান,

> ফিরে যা, যেখান থেকে এসেছিলি—

> দেহ নয়, আত্মা চায় শান্তি…"


📿 হঠাৎ ডালির চোখ দিয়ে ঝরল রক্ত!

সে কাঁপতে কাঁপতে বললো,

— “আমায় কেন ফিরিয়ে দিলে না? আমি তো শুধু ভালোবেসেছিলাম!”


আমি চিৎকার করলাম —

— “তুই তো ভালোবাসিসনি, তুই দখল চাস!

ভালোবাসা মানুষকে মুক্ত করে, শেকলে বেঁধে না।

আমি ডালিকে ভালোবাসি, তুই নয়!”


তখনই ঘরের সব বাতি একসাথে ঝনঝন করে জ্বলে উঠলো।

ঘরের মাঝখানে ধোঁয়ার মতো গঠিত হতে লাগলো এক নারী-ছায়া।

মাঝরাতে, ফুলসজ্জার ঘরে —

এক দগদগে প্রেমিক আত্মার বিলাপ।


> “আমি শুধু একটু জায়গা চেয়েছিলাম... একটু মমতা।

> এখন চলে যাচ্ছি,

> কিন্তু মনে রাখিস... কেউ কথা ভাঙলে সে মাফ পায় না।”


💥 একটা বিকট শব্দে আয়নাটা চুরমার হয়ে গেল!

মেঝেতে আগুনের রেখা জ্বলে উঠে নিভে গেল…


আর আমি দেখি, ডালি অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে — নিঃশ্বাস কিন্তু ধীর ও স্বাভাবিক।

আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম, ভয়ে নয় — ভালোবাসায়।

এই প্রথম ডালিকে আমি সত্যিকারের নিজের বলে অনুভব করলাম।




ঘরের জানালায় যেন এক মুহূর্তের জন্য

এক নারী ছায়া দাঁড়িয়ে রইলো।

চোখে শুধু অপূর্ণ ভালোবাসা আর না বলা প্রশ্ন...


---




ঘরটা নিঃশব্দ।

আয়না ভেঙে গেছে। বাতি নিভে গেছে।

মেঝেতে ছাইয়ের রেখা। আর আমার বুকের মাঝে ডালির নিস্তেজ শরীর।


আমি ধীরে ধীরে ওর কপালে ঠোঁট ছুঁইয়ে বললাম,

— “ডালি, ফিরে এসো। সব শেষ হয়ে গেছে।”


এক মুহূর্ত...

দুই...

হঠাৎ ডালির চোখ কাঁপল। তারপর সে ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকালো আমার দিকে।


চোখজোড়া ছিল ধকধকে ভেজা। কিন্তু এই প্রথমবার সেখানে ভয় নয় —

**ভালোবাসা**।


— “আমি... কোথায় ছিলাম?”

ডালির কণ্ঠে দুর্বলতা,

আমি ওকে বুকে জড়িয়ে ধরে বললাম,

— “তুমি আমার মধ্যে ছিলে... আর কেউ তোমাকে নিতে পারেনি।”


📿 আমরা দুজন বসে থাকলাম অনেকক্ষণ।

ঘরের বাতাস ভারী, কিন্তু শান্ত।


আমি ভাবলাম, সব শেষ।

কিন্তু শেষটা তখনও হয়নি।


---

পরদিন ভোর


পিসিমা ডাকলেন নিচে।

তার মুখ থমথমে। হাতে কিছু পুরনো নথি আর একটা **দীপ্তছবি**।


ছবিটায় এক তরুণী—মঞ্জুরা।

তার পাশেই একজন পুরুষ, হালকা দাঁড়ি, চোখে রোদচশমা।

নাম লেখা নেই।

তবে ছবির পেছনে ইংরেজিতে লেখা—


> **"To M — You are mine, no matter who I marry. —A"**


আমি অবাক হয়ে বললাম,

— “A মানে কি ‘নাসির’? আমার বাবা?”


পিসিমা মাথা নাড়লেন।

— “না। এই চিঠিগুলো তোকে দেখাইনি।”

— “তোর বাবা নয়, এই ‘A’ হচ্ছে **আজিজুল হক**।

তোর বাবার ছোটবেলার বন্ধু। এই বাড়িতেই থাকত একসময়।

আর মঞ্জুরার আসল প্রেমিক ছিল সে — আজিজ।”


আমি হতবাক।

— “তবে… বাবা কেন দায়ী হয়েছিল?”


— “কারণ আজিজ পালিয়ে যায় বিদেশে — আর তোর বাবা তখন বিষয়টা চাপা দিতে চায়।

চিঠিগুলো লুকায়, মেয়েটার গর্ভপাত ঘটায় জোর করে।

মঞ্জুরা ভেঙে পড়ে, ভাবে নাসিরই ওর প্রেমিক ছিল।

আর প্রতিশোধ নেয়... ভুল মানুষের ওপর।”


আমি চুপ।

এক ভয়ংকর বাস্তবতা ঘিরে ধরে।


> **মঞ্জুরার আত্মা ভুল মানুষের উপর প্রতিশোধ নিতে এসেছিল।

> কিন্তু সেও নিজের অতীতের অন্ধকার ভুলে গিয়েছিল।

> এক অভিশপ্ত প্রেম, যেটা কেবলই ভুলে আর রক্তে লেখা।**


---


সন্ধ্যার আগে...


আমি ডালিকে নিয়ে বসে থাকি জানালার পাশে।

ও বলে,

— “আমি যখন অজ্ঞান ছিলাম, একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম।

এক মেয়ে আমার শরীর চেয়ে বলেনি কিছু...

শুধু বলেছিল,


> ‘আমি চেয়েছিলাম শুধু একবার ভালোবাসার উত্তর… তা-ও পাইনি।’”


আমি ডালির হাত চেপে ধরি।

আমরা জানি, আমাদের জীবনে ছায়া ঘোরে —

কিন্তু এখন আমরা একসাথে।



পুরনো আলমারির পেছনে হঠাৎ একটি ছবি পড়ে যায় মেঝেতে।

ডালির চোখ পড়ে ছবির পেছনে লেখা লাইনে:


> **"আমি মরিনি।

> আমি আছি, যতদিন কারও চোখে প্রেম থাকবে—

> আর সেটা আমার নয়…"**

চলবে....

৫ম পর্ব লিংক 

https//www.sfgjkkbcshkkfashnnm

পর্ব ৩ তন্ত্র যুদ্ধে রক্ত বাসর গিয়াস উদ্দিন আহাম্মাদ

পর্ব: ৪

গিয়াস উদ্দিন আহাম্মাদ 

ডালির ঠোঁট ফাঁক করে অচেনা কণ্ঠে উচ্চারণ হয়েছিল:


> “মঞ্জুরা পানি চায়...”


আমি তখনো স্তব্ধ। এ যে ডালি না —

ওর শরীর, ওর চোখ, ওর স্পর্শেও এখন আর সেই পরিচিত উষ্ণতা নেই।

কেমন যেন একটা **আলগা শীতলতা** ছুঁয়ে থাকছে ওর চারপাশ।


চিঠির বাক্সটা আবার খুললাম।

ভেতরে পাতার পর পাতা, ধুলোপড়া পুরনো খাম — সবগুলোতে একই হাতের লেখা,

একই স্বর — **প্রেম, অপেক্ষা… আর শেষে ঘৃণা।**


একটা চিঠির খাম খুলতেই ঘরের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে গেল।

হলদে কাগজের পৃষ্ঠে লেখা ছিল—


> “তুমি বলেছিলে, বিয়ে করবে।

> আমি বিশ্বাস করেছিলাম।

> তুমি যখন আসোনি, আমি নিজেই এসেছিলাম…

> তোমার ঘরের পাশে, তোমার বিছানার নিচে আমার শেষ নিঃশ্বাস।

> এখন তুমি কারো হবেই না।”


আমি বুঝে গেলাম—

**মঞ্জুরা মরেনি দূরে কোথাও,

মরেছে এখানেই... এই ঘরেই।**


📿 আমি পিসিমাকে ডাকতে ছুটে যেতে চাই, দরজা খুলি—

দেখি বাইরে নেই কিছুই। ঘরের দরজার ঠিক বাইরে কালো কালি দিয়ে আঁকা অদ্ভুত চিহ্ন।

চিহ্নের নিচে লেখা —

**"ঘর ভাঙলে আত্মা ছিঁড়ে যাবে।"**


আমি ফিরে এসে দেখি ডালি বিছানার কোণে বসে আছে,

চোখ দুটো বন্ধ, ঠোঁট নড়ছে না — তবু **ঘর জুড়ে ওর গলা ভেসে আসছে**।


> “তুই মিথ্যা বলেছিলি।

> তোর কথা আমি বিশ্বাস করেছিলাম, ও আমার শরীর চেয়েছিল… প্রেম না।

> এখন আমি তোর প্রতিটি রাত নেব, প্রতিটি স্পর্শ।

> তুই যত ভালোবাসবি, আমি তত দহন করব!”


আমি এগিয়ে গিয়ে ওর গায়ে হাত রাখতেই…

🔥 হঠাৎ ওর শরীর জ্বলতে শুরু করল! না, আগুনের শিখা নয় —

একটা ধোঁয়া উঠছে, গরম পাথরের ওপর জল পড়লে যেমন শব্দ হয় তেমন শোঁ শোঁ শব্দ!


আমি ভয়ে পেছনে সরে আসি।

ডালির ঠোঁটে অশুভ হাসি— ঠোঁট বেয়ে রক্ত!

— “মনে পড়ে? তুমি প্রতিশ্রুতি ভেঙেছিলে। আমি এসেছি… কথা রাখতে।”


**আমি এবার নিশ্চিত — ওর মধ্যে আত্মা ভর করেছে, এবং এই আত্মা চায়… কিছু ফেরত। হয় প্রেম, না হয় প্রতিশোধ।**


ঘরের দেয়ালজুড়ে আগুনে দাগ ওঠে—

পুরো ঘরটা যেন মঞ্জুরার ডায়েরি হয়ে উঠেছে।

একেক দেয়ালে লেখা উঠে আসে নিজে নিজেই—


> “আমি জানালার ও পাশে অপেক্ষা করেছি।”

> “সে হাত ধরেছিল — কিন্তু ছিল অন্য নামের দুঃখ।”

> “ডালিকে ছাড়লে মাফ পাবি।”




আমি একটানা কাঁপছি। আর ডালির ঠোঁটে নিঃশ্বাসে ভেসে আসে…


> “তোমার যেটুকু ছিল, সেটাও আমি নিচ্ছি।”

> "আমি এসেছি পুরোটা নিতে… এই বউ নয়, এই ঘর নয়, **তুমি নিজে!"**



কোন প্রেমিক প্রতিশ্রুতি ভেঙেছিল?

কে ছিল মঞ্জুরার ভালোবাসা — আমি, না আমার রক্ত?

আর এই পৈতৃক বাড়ির দেয়ালগুলো এত বছর ধরে কী লুকিয়ে রেখেছিল?



"তোমার যেটুকু ছিল, সেটাও আমি নিচ্ছি..."

ডালির ঠোঁটে সেই অভিশপ্ত কণ্ঠস্বর রক্ত শীতল করে দেয় আমাকে।

ও কি আমার স্ত্রী? না কি এখন সে মঞ্জুরা?

আমি বুঝে উঠতে পারছি না।


আমি আর বসে থাকতে পারলাম না।


ঘর থেকে ছুটে বের হলাম। ছুটে গেলাম নিচে —

পিসিমার ঘরের দরজায় কড়া নাড়তেই ভেতর থেকে কাঁপা কণ্ঠে ডাক এলো,

— "তুই শুনেছিস, না দেখেছিস?"


— "কে ছিল পিসিমা? কে এই মঞ্জুরা?"


পিসিমার চোখে পানি জমে উঠলো।

সে কাঁপা গলায় বলে উঠলো…


> “ও ছিল এই বাড়িরই মেয়ে।

> আমার ছোট ভাইয়ের ছাত্রী। নাম ছিল মঞ্জুরা।

> গরীব ঘরের মেয়ে হলেও ছিল মেধাবী আর অপূর্ব রূপবতী।

> ওর চোখে স্বপ্ন ছিল বিদেশ যাবার, প্রেমে পড়েছিল আমার ভাইয়ের...”


আমি স্তব্ধ।


— "মানে? আমার বাবার?"


পিসিমা চোখ নামিয়ে বললেন—


> “হ্যাঁ, তোর বাবা... নাসির।

> মঞ্জুরা তার প্রেমে পড়েছিল।

> ওরা দেখা করত এই ঘরেই। ফুলদানি, আয়না, সেই চিঠিগুলো— সব সেই সময়ের।

> কিন্তু নাসির শেষ পর্যন্ত বিয়ে করে অন্যকে… তোর মাকে।”


> “মঞ্জুরা তখন অন্তঃসত্ত্বা ছিল।

> কিন্তু নাসির মানেনি।

> এক রাতে ঝড়ের সময়… সে ওই ঘরের জানালার পাশে দড়ি দিয়ে গলায় ফাঁস দেয়…”


আমার পায়ের নিচে থেকে যেন মাটি সরে যায়।


আমার বউ ডালি,

আমার ফুলসজ্জা,

আমার ভালোবাসা —

সবই কি সেই পুরোনো প্রতিশ্রুতি ভাঙার খেসারত?


পিসিমা চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন,

— “এই ঘর আমরা তালা দিয়ে রেখেছিলাম।

তুই আসার কথা শুনে খুলেছিলাম।

আমি ভাবিনি… মঞ্জুরা এখনো এখানে থাকবে।

তবু থেকে গেছে সে… প্রতীক্ষা করে।”


📿 আমি কাঁপতে কাঁপতে বলি,

— “তাহলে আমি কী করবো? ডালিকে কি হারাতে হবে?”


পিসিমা একটানা তাকিয়ে থাকেন আমার দিকে।

তার চোখে তখন শুধুই একটা কথা জ্বলজ্বল করে—


> **“তুই যদি নিজের রক্ত, নিজের বাবার অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত না করিস—

> তাহলে ডালিকে সে আর ফিরিয়ে দেবে না।”**



আমি ফিরে আসি ঘরে।

ঘর জুড়ে অন্ধকার, শুধু জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে ডালি।


কিন্তু আমি জানি,

**এ ডালি না... এটা মঞ্জুরা।**


সে মুখ ঘুরিয়ে তাকায়, ঠোঁটে সেই বিদ্রুপের হাসি।

— “শেষবারের মতো বলছি... আমার জায়গা ছেড়ে দে। নয়তো তুই হারাবি সব... সবকিছু।”


চলবে.....



মঞ্জুরাকে তাড়াতে পারবে কি?

নাকি ভালোবাসার নামে আত্মা চাইছে নতুন শিকার?

শুরু হবে মৃত্যুর সঙ্গে এক অলৌকিক দ্বন্দ্ব।

৪থ পর্ব লিংক 

https.www.partfourrshdhfzhgshjv.com 


তন্ত্র যুদ্ধে রক্ত বাসর পর্ব ২ গিয়াস উদ্দিন আহাম্মাদ

তন্ত্র যুদ্ধে রক্ত বাসর

পর্ব ২

গিয়াস উদ্দিন আহাম্মাদ 


ডালির কথা শুনে আমি প্রথমে থতমত খেয়ে গেলাম।


— “কি বললে? কেউ বলেছে? কে?”

আমি ঘাড় ঘুরিয়ে ঘরের চারপাশে তাকালাম।

গা ঘিনঘিনে অন্ধকারে কিছুই স্পষ্ট বোঝা যায় না।

একটা দেওয়ালঘড়ির কাঁটা কাঁট কাঁট করে সময় গুনছে—

তবুও যেন এই ঘরের বুকে সময় থেমে গেছে।


ডালি শক্ত করে আমার বাহু চেপে ধরলো।

ওর চোখ দুটো ততক্ষণে পানি আর ভয়ে ভারী হয়ে উঠেছে।

"আমি শুনেছি... আমি কানের কাছে একটা মেয়েলি গলা শুনেছি,"

— ওর কণ্ঠে কাঁপন, গলায় নিঃশ্বাস আটকে আসছে,

"সে বললো, 'তুমি আমার ছিলে, এখন কেন অন্য কাউকে ভালোবাসো?'"


আমার হৃদপিণ্ড যেন হঠাৎ এক ছন্দ ফেলে দুলে উঠলো।


— “ডালি, এটা তোমার কল্পনা। ভয় পেয়েছো তাই এমন শুনছো। হয়তো টিকটিকি কিংবা বাইরের গলায় প্রতিধ্বনি।”

আমি জোর করে হাসলাম, ওকে আশ্বস্ত করার ভান করলাম।

তবু সত্যি কথা, আমার নিজের গায়ের লোম দাঁড়িয়ে গেছে।


ঘরের এক কোনায় রাখা আয়নাটা যেন অন্ধকারের মধ্যেও কিছু বলছে।

আমি ওদিকে তাকাতেই কেমন যেন ঝাপসা… যেন আয়নার ভেতর কেউ এক ঝলক তাকিয়ে হাসলো—তীক্ষ্ণ নারকীয় হাসি।


আমি আর থাকতে পারলাম না।


📿 **“বাবা মা’র নাম মুখে আনলাম। কাঁধ থেকে সাদা তোয়ালে টেনে নিয়ে দ্রুত বাতি খুঁজতে লাগলাম। ব্যাটারি লাইটটা ঠিকই ছিল, কিন্তু তা জ্বালাতেই লাইট দু’বার ফ্ল্যাশ করে নিভে গেল!”**


ডালির কাঁধে মাথা রেখে আমি ওকে জড়িয়ে ধরলাম।


— “শোনো, আমরা কিছুক্ষণ নিচে যাই, পিসিমার ঘরে আলো জ্বলছে কি না দেখি।”

— “না না! আমি একা চলতে পারবো না!”

ডালি কেঁপে উঠলো।


আমি ওর হাত ধরলাম, ধীরে ধীরে দরজা খুললাম।


**ঘরের বাইরে বের হতেই শিউরে উঠলাম — আমাদের ঘরের সামনে মেঝেতে গাঢ় লাল কিছু ছড়িয়ে আছে!**


সন্ধ্যার ফুল? না…

আমার কণ্ঠ শুকিয়ে এল…


**সেইটা রক্ত! স্পষ্টভাবে কেউ আঙুল দিয়ে মেঝেতে লিখে রেখে গেছে –

“তুমি আমার ছিলে... ভুলে গেলে?”**


ডালি চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।

আমি স্তব্ধ! হঠাৎ সেই মুহূর্তে পিছন থেকে দরজা ‘ঠাস!’ করে বন্ধ হয়ে গেল।


🔒 আমরা আবার সেই ঘরে,

তবে এবার শুধু আমরা দু’জন না —

**ঘরে আছে আরও কেউ…**


ঘরের দরজাটা এমনভাবে বন্ধ হলো, যেন কেউ ঠেলে দিল ভিতর থেকে।

আমার মেরুদণ্ডে ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে গেল।

ডালি কেঁপে উঠলো। হাতটা শক্ত করে চেপে ধরলো আমার।

ঘরে তখনো আঁধার, শুধু বাইরের ম্লান আলো জানালার কাঁচ ছুঁয়ে আসছে।


আমার চোখ চলে গেল বিছানার পাশের আয়নাটার দিকে।


সেই আয়নাটা...


আগেও দেখেছিলাম, কিন্তু তখন মনে হয়নি এতটা অদ্ভুত।

এবার যেন সেটার ভিতর অস্বাভাবিক কিছু দেখা যাচ্ছে।


আমি ধীরে ধীরে কাছে গিয়ে তাকালাম।


আমার প্রতিবিম্বটা স্পষ্টই আছে।

তবে… **পাশে আরেকটা ছায়া!**

যেটা বাস্তবে নেই।

কেউ যেন আমার কাঁধের উপর দিয়ে আয়নার ভেতর থেকে তাকিয়ে হাসছে—

ঠোঁটে রক্তচাপা হাসি, চোখে নিঃশব্দ বিদ্বেষ।


"ডালি... তুমি আয়নার কাছে এসো না।"

আমার গলা কাঁপে।

ডালিকে পিছনে সরিয়ে আমি নিজে সামনে এগিয়ে গেলাম।


আমি যখন হাতে মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে আয়নার পেছনে তাকাতে গেলাম—

কিছুই নেই।

সাধারণ কাঠের দেয়াল, ধুলো জমা পর্দা।

কিন্তু আয়নায় আবার তাকাতেই... সেই ছায়াটা উধাও হয়ে গেছে!


আমি বিভ্রান্ত। মাথা ঘুরে উঠলো।


— "তুমি... তুমি বুঝতে পারছো না, কেউ আসলেই আমাদের দেখে।"

ডালি কাঁদছে। ওর মুখটা শিউরে উঠছে আতঙ্কে।


হঠাৎ করেই ডালির আচরণ বদলে যেতে লাগলো।


**ওর গলা বদলে গেল— গভীর, অচেনা এক কণ্ঠ।**

— “তুমি কথা দিয়েছিলে। আমাকে নিয়ে যাবে। ভুলে গেলে?”


আমি হতবাক!

— “ডালি? তুমি এটা কী বলছো?”

ওর চোখ দুটো এতক্ষণে লালচে। শ্বাস নিচ্ছে অস্বাভাবিক ঘন ঘনভাবে।

আমি ওর কাঁধে হাত রাখতেই ও আঁতকে উঠলো, ঠেলে দিল আমাকে।


— “ও আমার ছিল। ওর শরীর আমার ছিল!”

ওর ঠোঁট ফাঁক হয়ে উচ্চারণ করলো সেই নারীকণ্ঠ—

একটা গভীর আত্মার রাগ যেন উঠে আসছে।


**আমি পিছিয়ে গেলাম। এবার নিশ্চিত—ডালির মধ্যে কেউ ঢুকেছে।**


ঘরের বাতাস আরও ভারী, ঠান্ডা।


আমি বিছানার পাশ থেকে পুরোনো একটা কাঠের বাক্স বের করলাম।

এটা পিসিমার পুরোনো আলমারিতে ছিল।

পিছনে সাঁটানো কিছু কাগজপত্র, একটা পচা গোলাপ, আর কিছু ধুলোমাখা চিঠি।


চিঠিগুলো খুলতেই চোখ কপালে ওঠে।

**সবগুলো লেখা এক নারীর হাতে — যার নাম ‘মঞ্জুরা’।**


একেকটা চিঠিতে লেখা:


> “তুমি বলেছিলে, আমায় বিয়ে করবে।”

> “তোমার মায়ের ভয়েই তুমি পেছিয়ে গেলে?”

> “তোমার ঘরেই আমি নিজেকে শেষ করেছি।”

> “তোমার বিছানা, তোমার বউ— এখন আমার!”


আমার বুক ধক করে উঠলো।

এই ঘরে কেউ আত্মহত্যা করেছিল? আর সেই প্রেতাত্মা এখন ফিরে এসেছে?


ঠিক তখনই ডালি মাথা নিচু করে ফিসফিস করে বলে উঠলো,

— “আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে… মঞ্জুরা পানি চায়...”


চলবে....